প্রেস প্রবন্ধসমূহ

নিরাপদ মাতৃত্বের নামে সিজারিয়ান ডেলিভারি বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ সরকারের

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফাহমিদা হক ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। সম্প্রতি তিনি প্রথমবারের মতো মা হয়েছেন। এলাকার একজন পরিচিত গাইনি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন তিনি। ফাহমিদা বলেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার বা আমার গর্ভের সন্তানের কোন সমস্যা ছিল না। ফলে চিকিৎসক জানিয়েছিল আমার নরমাল ডেলিভারি হবে। কিন্তু আমার ডেলিভারির কয়েক দিন আগে আমি যেই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ছিলাম তিনি দেশের বাইরে চলে যান। পরে আমার স্বামী আমাকে একটি অভিজাত হাসপাতালে ডেলিভারির জন্য ভর্তি করায়। সেখানকার নামকরা একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ আমাকে দেখে এমন কিছু সম্ভাব্য সমস্যার কথা বলে দ্রুত সিজার করার কথা বললেন। এ কথা শুনে আমি ও আমার পরিবারের লোকজন ভয় পেয়ে যাই। আমরা কেউই সন্তানের ব্যাপারে রিস্ক নিতে চাইনি। তারিখের আগেই আমার সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়। আমি পুত্র সন্তানের মা হলাম। জন্মের পর আমার ছেলের কোন সমস্যা হয়নি। খরচের বিষয়টা জানতে চাইলে ফাহমিদা জানান সব মিলিয়ে তার খরচ পড়েছে ৮০ হাজার টাকার মতো।

মিরপুরের বাসিন্দা বন্দনা দাস। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক। সম্প্রতি তিনিও সন্তানের মা হয়েছেন। তাকেও বলা হয়েছিল নরমাল ডেলিভারি হবে। কিন্তু পরবর্তীতে বেশ কিছু সমস্যার কথা বলে সিজারিয়ান ডেলিভারি করার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। মিরপুরের স্থানীয় একটি ক্লিনিকে তার সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়। হাসপাতালের এক প্যাকেজের আওতায় এর জন্য তার খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা।

নিরাপদ মাতৃত্বের কথা বলে দেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান ডেলিভারি সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে একটি দেশে সিজারিয়ান অপারেশনের হার হবে সর্বমোট প্রসবের ১০ থেকে ১৫ ভাগ। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার ২০১০ খেকে ২০১৬ সালে এই হার ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১ শতাংশ হয়েছে। যার অধিকাংশই অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে সিজারিয়ান অপারেশনের হার অত্যন্ত বেশি। প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে সিজারিয়ান অপারেশনের হার শতকরা ৮৩ ভাগ যেখানে সরকারি হাসপাতাগুলোতে তা ৩৫ ভাগ।

অভিযোগ রয়েছে, প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে কোন প্রসূতিকে নিয়ে আসা হলেই বেশির ভাগ চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই প্রসূতিকে সিজারিয়ানের জন্য বিভিন্ন কৌশলে বাধ্য করে। কারণ নরমাল ডেলিভারির চেয়ে সিজারিয়ানে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক অনেক বেশি টাকা পান। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও লাভ হয়। নরমাল ডেলিভারি হলে রোগী এক-দুই দিনের মধ্যে বাসায় চলে যেতে পারেন। খরচ কম। কিন্তু সিজারিয়ানে একজন রোগীকে বেশি সময় হাসপাতালে থাকতে হয়, ওষুধ বেশি লাগে। এতে হাসপাতালের ব্যবসা বাড়ে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের তথ্য মতে, অস্ত্রোপচারে রোগীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ করতে হয়। হাসপাতালে অবস্থানের সময় ধরা হয়েছে সাত দিন। প্রত্যক্ষ খরচের মধ্যে আছে ওষুধ, চিকিৎসক, হাসপাতালে থাকা-খওয়া, হাসপাতালে যাওয়া-আসা। পরোক্ষ খরচের মধ্যে ধরা হয়েছে উপার্জনে ক্ষতি (এই বয়সী নারীদের বড় অংশ উপার্জনক্ষম), স্বামীর উপার্জনে ক্ষতি এবং পরিবারের অন্যদের উপার্জনে ক্ষতি। এ ছাড়া ২৫ শতাংশ রোগীকে অস্ত্রোপচার পরবর্তী জটিলতায় ভুগতে হয়, এর কারণে বাড়তি খরচ হয় (১২ দিন ধরা হয়েছে)। এদের ওষুধ, চিকিৎসক, হাসপাতালে থাকা, খাবার এবং আত্মীয়দের হাসপাতালে যাওয়া-আসার জন্য বাড়তি খরচ হয়। সব মিলে একটি অস্ত্রোপচারে গড়ে ৫৫২ মার্কিন ডলার বা ৪৪ হাজার ১৬০ টাকা ব্যয় হয় (উপার্জনের ক্ষতিসহ)।

ধাত্রী বিদ্যা বিশেষজ্ঞ ও গাইনি চিকিৎসকদের সংগঠন অবস্ট্রাটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)-এর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. আনোয়ারা বেগম সংবাদ’কে বলেন, নিশ্চিত কিছু লক্ষণ বা উপসর্গ আছে, যা দেখে বলা যায় সিজার লাগবে কি না। কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিজারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসবের সময়ে হঠাৎ কোন বিপর্যয় এড়াতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে সিজার করা দরকার হয়ে পড়ে। তবে দেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারের সংখ্যা বাড়ছে।

এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, অনেক সময় চিকিৎসকরা যেমন রোগীদের সিজার করাতে উৎসাহিত করেন তেমনি অনেক ক্ষেত্রে রোগীর পক্ষ থেকেও আগ্রহ থাকে। এটা শিক্ষিত নারীদের মধ্যে বেশি। মায়েরা ব্যথা সহ্য করতে চান না। চিকিৎসকরাও অনেক সময় ঝুঁঁকি নিতে চান না। নতুন চিকিৎসকদের মধ্যে ধৈর্যেরও অভাব রয়েছে।

সম্প্রতি অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান ডেলিভারি বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালম আজাদ বলেন, আমরা স্বীকার করি বাংলাদেশে সিজারিয়ান অনেক বেড়ে গেছে। এটা যাতে না হয়, যেখানে সিজারিয়ান করার প্রয়োজন নেই, সেখানে যাতে সিজারিয়ান করা না হয়, সেজন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ফরম করেছি। যেখানে সিজারিয়ান হবে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে ফরম পূরণ করে আমাদের জানাতে হবে। আমারা এগুলো চেক করব। তারা যে তথ্য আমাদের জানাচ্ছে তা সঠিক কি না। সেক্ষেত্রে যারা বিনা প্রয়োজনে সিজারিয়ান করাবে, সেখানে যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার সে ধরনের আমরা ব্যবস্থা নেব। ফরমে মোবাইল নম্বরও নেয়া হবে।

সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. ইশতিয়াক মান্নান বলেন, পরিস্থিতি সত্যিই উদ্বেগজনক। সিজারিয়ান অপারেশনের বিষয়টি সেবাগ্রহীতার পছন্দের উপর ছেড়ে দিলে চলবে না, তাকে প্রয়োজনীয় সব তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে হবে। সজারিয়ান অপারেশনের ভালো ও মন্দ দিক গুলো সেবাগ্রহীতা’কে বুঝিয়ে বলতে হবে।

হটলাইন নম্বর
xxxxx