প্রেস প্রবন্ধসমূহ

সিজারিয়ানে সন্তান প্রসবের হার বাড়ছে

দেশে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার বাড়ছে। বর্তমানে এ হার ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৪ সালে ছিল ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ তিন বছরে এ হার ১২ শতাংশ বেড়েছে। ২০১১ সালে সিজারিয়ান অপারেশনে সন্তান প্রসবের হার ছিল ১৫ শতাংশ। শিশু জন্মের এ হার সম্পর্কে জানা গেছে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভ এর তথ্য থেকে।

 

আরও জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালের তুলনায় প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে তুলনামূলকভাবে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার অনেক বেশি। উচ্চবিত্ত প্রসূতিদের মধ্যে সিজারিয়ানের প্রবণতা বেশি। প্রসবের সময় অপ্রয়োজনীয় সিজার বন্ধের দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদেও। সেই সঙ্গে এতে জড়িত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। সংসদ সদস্য নুরজাহান বেগম মুক্তা এ দাবি জানান। তিনি বলেন, ইদানীং উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, দেশে স্বাভাবিক প্রসবের চেয়ে সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের পরিসংখ্যান অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আশঙ্কাজনক। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করা যাবে তখনই যখন প্রসবকালীন জটিলতার কারণে শুধু প্রসূতি মায়েদের জীবন বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত ও ধনী মানুষের মধ্যে অস্ত্রোপচারের প্রবণতা বেশি। বর্তমানে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে ৮০ শতাংশ সন্তান প্রসব হচ্ছে সিজারের মাধ্যমে। মেডিকেল ইন্ডিকেশন মেনে চললে ধনী-দরিদ্র সব ক্ষেত্রে এর হার এক হতো। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রচারিত স্বাস্থ্য বুলেটিন ২০১৫তে দেখা গেছে, উপজেলাগুলোয় সিজারের মাধ্যমে শিশু জন্মের সংখ্যা প্রায় ৮ গুণ বেড়েছে। ২০১৩ সালে দেশের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোয় সন্তান প্রসবের জন্য ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭২১ প্রসূতি মা ভর্তি হন। এর মধ্যে ৪৮ হাজার ৮৬৮ জন প্রসূতি স্বাভাবিক প্রসব করেন, আর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৩ শিশুর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১০০ প্রসূতির মধ্যে ৮০ জনেরই স্বাভাবিক প্রসব করানো যেত।

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস-২০১৪) তথ্যে জানানো হয়, সরকারি হাসপাতালে নিরক্ষরদের মধ্যে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ও দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যে ২ দশমিক ৬ শতাংশ প্রসূতির সিজারিয়ান হয়। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ, ধনী শ্রেণীর মধ্যে ৩২ দশমিক ২ শতাংশ সিজারিয়ানে আগ্রহী।

সাজেদা সুলতানা ঢাকা বিশ্বদ্যিালয় থেকে এমএসসি পাস করেছেন। ১৭ বছর আগে তার ছেলে হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি বিভাগে। সাজেদা এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি সিজার করেছি ব্যথা সহ্য করতে না পেরে। হয়তো অপেক্ষা করলে স্বাভাবিক প্রসবেই সন্তান হতো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল এক বছরে ১ হাজার ৭০১ জন সন্তানসম্ভবা মা হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে ১ হাজার ১৭২ জনের সন্তান হয় অস্ত্রোপচারে। আবার চিকিৎসকরা নিজেরাই সিজার করতে আগ্রহী হন এমন প্রমাণও রয়েছে ভূরি ভূরি। অস্ত্রোপচার সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, গর্ভবতী নারী বা তার পরিবার মনে করে, অস্ত্রোপচারে ঝুঁকি কম। তবে কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও হাসপাতাল অস্ত্রোপচারে প্ররোচিত করে।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের অধ্যাপক এবং অবসট্রেটিক অ্যান্ড গাইনোকোলোজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফেরদৌসী বেগম সাংবাদিকদের বলেন, অস্ত্রোপচারে কাটা-ছেঁড়া ও রক্তক্ষরণের কারণে মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি থাকে। তাই প্রয়োজন ছাড়া অস্ত্রোপচারে যাওয়া উচিত নয়। গর্ভে সন্তান কেমন আছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রযুক্তি সহজলভ্য করতে হবে; যেন অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের কথা বলার সুযোগ কেউ না পান।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক ডা. নীলুফা সুলতানা বলেন, সিজারিয়ানের জন্য ঢালাওভাবে চিকিৎসকদের দায়ী করা যায় না। বেশিরভাগ সময়ে মা বয়সী হলে, বেশি অসুস্থ হলে, শিশুর পজিশন বেকায়দা হলে চিকিৎসকরা সিজার করতে বাধ্য হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গর্ভধারণের সময় নানা কারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়।

হটলাইন নম্বর
xxxxx