প্রেস প্রবন্ধসমূহ

১০০ তে ৭৫ শিশুর জন্ম অস্ত্রোপচারে

দেশে সিজারিয়ান প্রসবের হার আশংকাজনক হারে বেড়েছে। বর্তমানে দেশে বছরে ৩১ লাখ শিশুর জন্ম হয়। এর মধ্যে ১০ লাখ শিশুর জন্ম হয় হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। যার মধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জন্ম নেয় সাড়ে ৭ লাখ। এ ছাড়া এনজিও মালিকানাধীন ও সরকারি ৪৩ হাজার হাসপাতালে জন্ম নেয় ১ লাখ ৫৫ হাজার শিশু। বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোতে মোট প্রসবের ৮৩ শতাংশই হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

সে হিসেবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ৭৫ শিশুর জন্ম বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে। অথচ, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর জন্ম হলে মা ও সন্তান দুজনের স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কার সঙ্গে রয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতসব আশংকা থাকা সত্ত্বেও দেশে সিজারিয়ান প্রসবের হার বাড়ছে, কারণ দেশে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনি কোনও ব্যবস্থাপনা কার্যকর নেই।

গত ২২ নভেম্বর প্রকাশিত জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট) এর  ‘বাংলাদেশের মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা জরিপ ২০১৬’ তে বলা হয়েছে সিজারিয়ান প্রসবের হার আশংকাজনকভাবে বেড়েছে।

আর বছরে হাসপাতালে জন্ম নেওয়া ১০ লাখ শিশুর মধ্যে ৭ লাখ ৫০ হাজার শিশুর জন্মই হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বেসরকারি হাসপাতালে। সেই হিসেবে বছরে প্রায় ৩১ শতাংশ শিশুর জন্ম হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

জরিপে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে একটি দেশের মোট প্রসবের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রসব সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচারের মধ্যে সীমিত থাকার কথা বলা হলেও বাংলাদেশে এই হার শতকরা ৩১ শতাংশ, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত হারের প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি।

জরিপে আরও বলা হয়, ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে প্রসবের হার ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৯ শতাংশ, আর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসবের হার ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩১ শতাংশ।

দেশে মোট সিজারিয়ান প্রসবের ৭৯ শতাংশ হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল আর ক্লিনিকগুলাতে। আর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলাতে মোট প্রসবের ৮৩ শতাংশ প্রসবই হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

লন্ডন প্রবাসী কাকলি রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘মগবাজারে একটি নামকরা হাসপাতালে যাওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তারা আমাকে অস্ত্রোপচারের জন্য চাপ দিতে থাকে, প্রসব ব্যথার ওঠার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই। অথচ দেশের বাইরে প্রায় প্রসব ব্যথার ৩৬ ঘন্টা পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য।’

তিনি বলেন, ‘প্রথমেই সেদিন আমাকে চিকিৎসকরা দুর্বল করে দেন নানা ধরণের সমস্যার কথা বলে, অথচ তখন আমি মানসিকভাবে এমনিতেই দুর্বল। নানা সমস্যার কথা বলে তারা আমাকে অস্ত্রোপচারের দিকে প্রভাবিত করে। রীতিমতো হাসপাতালগুলো ব্যবসা করছে মায়েদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে।’

অপরদিকে, ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শারমিন আক্তার সারাবাংলাকে বলেন, স্বাভাবিক প্রসবের সিদ্ধান্ত নিলেও চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি অস্ত্রোপচার করতে বাধ্য হন। শারমিন বলেন, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার থেকেও সিজারিয়ান প্রসবকে বেছে নিয়েছেন অনেকে, এটাও দেখেছি।

তবে বেসরকারি একটি ফোন কোম্পানিতে কাজ করা মালিহা বিন সাত্তার বলেন, এখনতো কারও সন্তান প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিয়েছে এটা শোনাই যায় না। আশেপাশের সবার সন্তানই জন্ম নিয়েছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

অস্ত্রোপচার মা এবং সন্তান দুজনকেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে মন্তব্য করে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিলকিস বেগম অবশ্য অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের জন্য দায়ী করেছেন পরিবারের ইচ্ছে, বেশি বয়সে বিয়ে এবং সন্তান ধারণ ও বেসরকারি হাসপাতালের প্রাধান্যকে।

ডা. বিলকিস বেগম বলেন, বর্তমানে পরিবারগুলোতে সিজারিয়ানের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। রোগী কিংবা তার পরিবার যখন হাসপাতালে এসে প্রথমেই অস্ত্রোপচারের কথা বলেন তখন চিকিৎসকদের কিছু করার থাকে না। তবে একইসঙ্গে বেসরকারি হাসপাতালের মুনাফার মানসিকতাকেও উড়িয়ে দিতে পারছি না।

অপরদিকে, আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন আব্বাসি সাম্প্রতিক সিজারিয়ান প্রসবের হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে সামাজিক প্রেক্ষাপট, রোগীর নিজস্ব পছন্দ, আনঅথোরাইজড হাসপাতাল, বেশি বয়সে সন্তান ধারণসহ নানা কারণ উল্লেখ করেন।

শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীরা এখন আর লেবার পেইনটাকে নিতে চায় না মন্তব্য করে ডা. শারমিন আব্বাসি বলেন, এখন অথোরাইজড এবং আনঅথোরাইজড হাসপাতালের সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক হাসপাতালে হয়তো একজন কনসালটেন্ট থাকলেও প্রশিক্ষিত ধাত্রী এবং চিকিৎসকের খুব অভাব। এই অভাবের কারণে একজন চিকিৎসক যদি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ডিউটিতে থাকলে তিনি চান তার ওই সময়ের মধ্যেই ডেলিভারির কাজটা শেষ করে ফেলতে। কিন্তু একজন রোগীকে নিদেনপক্ষে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত আমাদেরকে ফলোআপে রাখা উচিত, তাকে সময় দেওয়া উচিত। তাই এসব রোগীদেরকে যারা দেখাশোনা করবেন সে পোস্টগুলো হাসপাতালগুলোতে নেই।

ডা শারমিন আব্বাসি আরও বলেন, আগে রক্তক্ষরণ, অ্যাকলামসিয়া-প্রিঅ্যাকলামসিয়াতে মাতৃমৃত্যু হার বেশি থাকলেও এখন ইনডিরেক্ট (পরোক্ষ) ম্যাটারনাল মর্টারিটির হার বেশি। আর এসব পরোক্ষ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে থাইরয়েড, ডায়াবেটিস,  উচ্চরক্তচাপসহ কিছু অসুখ। তাই যখন একজন মায়ের এসব সমস্যাগুলো থাকে তখন কেউ আর রিস্ক নিতে চান না, সিজার করে ফেলেন।

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসবের হার আশঙ্কাজনক এবং সেটি গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি-সারাবাংলাকে বলেন সেভ দ্য চিলড্রেনের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. ইশতিয়াক মান্নান। তিনি বলেন, মোট অস্ত্রোপচারের এই প্রবণতা বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে আরও বেশি। আর এর অন্যতম কারণ এসবক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনি কোনও ব্যবস্থাপনা কার্যকর নেই।

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসবের হার বাড়ার ফলে জনগণের ওপর আর্থিক এবং স্বাস্থ্যগত যে চাপ পড়ছে তাকেও আশঙ্কাজনক বলে মন্তব্য করলেন ডা. ইশতিয়াক মান্নান। তিনি বলেন, এভাবে যদি চলতে থাকা ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ বা সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন করার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ বা সঠিক চিকিৎসা যে মান সেটা যদি মানা হতো তাহলে এই পরিমান অস্ত্রোপচার দরকার হতো না। আর অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ফলে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি, অর্থনৈতিক ঝুঁকি, সামাজিক ঝুঁকিতে পরছে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

ন্যাশনাল লো বার্থ ওয়েট সার্ভে-২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, ২০০১ সালে ৩ শতাংশ শিশুর জন্ম হতো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। ২০০৩-’০৪ সালে সিজরিয়ানের মাধ্যমে শিশু জন্মের হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১০ সেটি বেড়ে হয় ১২ শতাংশ, ২০১১ বেড়ে হয় ১৫ শতাংশ, যা তিন বছরে ৮ শতাংশ বেড়ে ২০১৪ সালে ২৩ শতাংশ, ২০১৫-১৬ সালে সেটি বেড়ে হয় ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশে।  একই সময়ে স্বাভাবিকভাবে শিশু জন্মের হার ৯৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৬২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মোট হিসেবে গত ১২ বছরে এই হার বেড়েছে ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ।

হটলাইন নম্বর
xxxxx