প্রেস প্রবন্ধসমূহ

প্রাইভেটে ডেলিভারি মানেই সিজারিয়ান

রাজধানীর ধানমণ্ডির একটি বড় হাসপাতালে সন্তান প্রসব করেছেন একই এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী সাবরিনা সাহানা। পাঁচ দিনের মাথায় হাসপাতাল থেকে বিদায়ের দিন স্বামী ফারুক হোসেন পড়েন বিপাকে। বিল হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু তাঁর কাছে আছে এক লাখ টাকা। ধারদেনা করে বাকি ২০ হাজার টাকা জোগাড় করতে তাঁর পার হয়ে যায় ছয় ঘণ্টা। ডিসকাউন্টের জন্য অনুনয়বিনয় করেও তেমন কোনো লাভ হয়নি; হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কমিয়েছে মাত্র দুই হাজার টাকা।

ডেলিভারিতে এত টাকা লাগল কেন—জানতে চাইলে ফারুক বলেন, ‘আমার স্ত্রীর সব কিছু নরমালই ছিল, কিন্তু ডাক্তার নিজ থেকে নরমাল ডেলিভারির বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত না দিয়ে বরং আমার সিদ্ধান্ত চাইলেন। আমার ও আমার স্ত্রীর মনে এক ধরনের সন্দেহ ধরিয়ে দিলেন। যা থেকে বুঝতে পারছিলাম ডাক্তার সিজার করতেই বেশি আগ্রহী। নরমাল ডেলিভারিতে না গিয়ে সিজার করতে বললাম। সিজার ঠিকঠাক মতো হলেও পরে ইনফেকশন হয়ে যায়। ফলে বাড়তি চিকিৎসা নিতে হয়।’

একটি প্রাইভেট ব্যাংকের কর্মী সুলতানা মরিয়ম বলেন, ‘প্রথমে নরমাল ডেলিভারিরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু হাসপাতালের নার্সরা ঘুরেফিরেই নানা কথা বলছিল। একপর্যায়ে ভয়ে সিজার করালাম। যদিও পরে ডাক্তার বলছিলেন, নরমাল ডেলিভারিতে সমস্যা হতো না।’

এমন এক-দুটি নয়, ঢাকাসহ সারা দেশেই প্রতিদিন কোনো না কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান জন্ম নিচ্ছে, যা নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে খোদ প্রসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মধ্যেই। তাঁরাও এখন চান অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশন কমিয়ে আনতে। বিশেষ করে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে সিজারিয়ানের ব্যবসা বন্ধে একাট্টা হচ্ছেন চিকিৎসকসহ অন্য বিশেষজ্ঞরাও। শিগগিরই নিরাপদ প্রসব বিষয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত ‘পার্টোগ্রাফ প্রটোকল’ অনুসরণ বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনৈতিকভাবে মুনাফা অর্জনের মানসিকতা পরিহারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও ওই প্রটোকল বাধ্যতামূলক করার জন্য তাগিদ দেন বিশেষজ্ঞরা। তবে প্রটোকল মেনে দীর্ঘসময় নিয়ে একজন রোগীর পেছনে লেগে থাকার মতো জনবল এ দেশে না থাকায় বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি ‘স্টপ আননেসেসারি সিজারিয়ান’ নামে একটি প্রচারণায় যুক্ত হয়েছেন খ্যাতিমান গাইনি বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. শাহলা খাতুন, অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম, অধ্যাপক ডা. রওশন আরা, অধ্যাপক ডা. সেলিনা বেগম, অধ্যাপক ডা. মালিহা রশিদ, ডা. সামস এল আরেফিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গাইনি বিশেষজ্ঞ এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা। তাঁরা অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান ঠেকাতে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। যদিও তাঁদের কেউ কেউ অবশ্য অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের জন্য কখনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, কখনো প্রসূতি বা তাঁর পরিবার কিংবা পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাব থাকা চিকিৎসাকর্মীদের দায়ী করেন।

জাতীয় অধ্যাপক ডা. শাহলা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, সব কিছুই এখন ব্যবসায়িক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে চিকিৎসাসেবাও এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। একশ্রেণির চিকিৎসাকেন্দ্র প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান করে ফেলছে। চিকিৎসকদের একটি অংশ এই অন্যায়ে জড়িত হচ্ছে, যারা প্রসূতিদের প্রভাবিত করছে। এগুলো বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

মা ও শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সেভ দ্য চিলড্রেনের উপপরিচালক ডা. ইশতিয়াক মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে শুধু ১০-১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে নরমাল ডেলিভারি না হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। কেবল সে ক্ষেতেই মা ও সন্তানের জীবন রক্ষার স্বার্থে সিজারিয়ান সেকশন বা সি-সেকশন দরকার হতে পারে। এর বেশি হলেই তা অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান। বাংলাদেশে ২০০৪ সালে সিজারিয়ানের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশে। এর মধ্যে কমপক্ষে ৮ শতাংশ হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান। দেশে ১০ বছরের ব্যবধানে সিজারিয়ান ডেলিভারি বেড়েছে ছয় গুণ, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়।

ডা. ইশতিয়াক বলেন, বাংলাদেশে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে প্রায় ৮০ শতাংশ ডেলিভারিই হচ্ছে সি-সেকশনের মাধ্যমে, যেখানে সরকারি হাসপাতালে এই হার ৩৮ শতাংশ। আবার দেখা যাচ্ছে, প্রসূতিরা যত ধনী ও শিক্ষিত, তাদের মধ্যে সি-সেকশনের হারও তত বেশি। অর্থাৎ যারা সচেতন থাকার কথা তারাই এ ক্ষেত্রে বেশি অসচেতন।

পরিসংখ্যান তুলে ধরে ওই বিশেষজ্ঞ জানান, কেবল প্রাইভেটেই নয়, প্রাইভেটের প্রভাবে দ্রুত দেশের সরকারি হাসপাতালেও সি-সেকশনের হার ঊর্ধ্বমুখী। তার প্রমাণ হচ্ছে সরকারি হাসপাতালেই ২০০৪ সালে এই হার ছিল বছরে মোট ডেলিভারির ৫ শতাংশ। ২০০৭ সালে ৯, ২০১১ সালে ১৭, ২০১৪ সালে ২৩ এবং ২০১৬ সালে বেড়ে হয় ৩৮ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সি-সেকশন একটি বিশেষ ব্যবস্থা এবং তার অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। যেহেতু এটি একটি গুরুতর অপারেশন, তাই অপারেশন চলাকালে ও পরবর্তী সময়ে জটিলতা হতে পারে। পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক অজ্ঞান করে এই অপারেশন করতে হয় বলে এনেসথেসিয়া সম্পর্কিত জটিলতাগুলো হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সি-সেকশন পরে প্রসূতি মানসিক চাপ, অতৃপ্তি, বাচ্চার সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক ইত্যাদি সমস্যায় ভোগেন। অপারেশনের ক্ষত থেকে বন্ধ্যাত্ব এবং পরবর্তী গর্ভাবস্থায় গর্ভপাত, গর্ভফুলের অবস্থান সংক্রান্ত নানা জটিলতা এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের আশঙ্কা বেড়ে যায়। একইভাবে বেশি অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশনের সঙ্গে বেশি নবজাতক ও শিশুমৃত্যু এবং বেশি প্রি-টার্ম (সময়ের আগে জন্মানো) ডেলিভারি সম্পর্কযুক্ত। এ ছাড়া প্রসূতি ও পরিবারের সদস্যদের পারিবারিক, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। নরমাল ডেলিভারির চেয়ে সি-সেকশন অনেক বেশি ব্যয়বহুল বলেই একশ্রেণির প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডেলিভারির রোগী পেলেই তাদের নানা কৌশলে প্রভাবিত করা হয় সিজারিয়ানের জন্য।

মানা হচ্ছে না পার্টোগ্রাফ : নিরাপদ মাতৃত্ব নিয়ে কাজ করা ‘এনজেন্ডার হেলথ’-এর বাংলাদেশের প্রধান ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে কিছু হাসপাতালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এক গবেষণায়  দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট প্রসবের মধ্যে ৯৭ শতাংশই হয়ে থাকে একরকম অনুমাননির্ভর। ডেলিভারির সময় স্বীকৃত যে প্রটোকল বা অপরিহার্য তা পুরোপুরি না মেনেই হয়ে থাকে বেশির ভাগ সিজারিয়ান বা নরমাল ডেলিভারি। মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘পার্টোগ্রাফ’ প্রটোকল মানা হয়। তাও আবার শতভাগ নয়। ফলে দেশে প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যুর হার যেমন আশানুরূপভাবে কমছে না, তেমনি নবজাতক ও মায়েদের প্রসব-পরবর্তী শারীরিক জটিলতা লেগেই থাকে।

ডা. ইশতিয়াক মান্নান বলেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুসারে নিরাপদ প্রসবের স্বার্থে অবশ্যই নির্দিষ্ট পার্টোগ্রাফ ফলো করতে হবে। এতে প্রসবের কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই নিয়মিত প্রসূতির শারীরিক অবস্থা এবং গর্ভের শিশুর অবস্থা বিভিন্ন সূচকের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করে তা লিপিবদ্ধ করতে হবে। শেষে ওই পার্টোগ্রাফের সব সূত্র মিলিয়ে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন প্রসূতির ঠিক কোন মুহূর্তে কোন পদ্ধতিতে সন্তান প্রসব করানো সঠিক হবে। এ জন্য যেসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের ব্যবস্থা আছে সেখানেই প্রতিটি প্রসূতির জন্য একটি করে পার্টোগ্রাফের ব্যবস্থা থাকতে হয়।

ড. জামিল বলেন, বাংলাদেশে গবেষণাকালে অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পার্টোপ্রাফ থাকলেও তা ব্যবহার না করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পার্টোগ্রাফ ছিলই না। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর মধ্যে ৬০ শতাংশ, মাতৃ ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের ৫৫ শতাংশ ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ২০ শতাংশে পার্টোগ্রাফ সরবরাহ থাকতে দেখা গেছে।

গাইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্টোগ্রাফে যেসব প্যারামিটার থাকে তা অনুসরণ করলে প্রসূতির প্রসবকালীন করণীয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ফলে প্রসবকালে মা বা শিশুর অবস্থা বোঝা যায়, কোনো ধরনের কোনো ঝুঁকি থাকে না। কিন্তু এই পার্টোগ্রাফ অনুসরণ করতে হলে প্রসবের আগে ১০-১২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ চালাতে হয়। বাংলাদেশের মতো কোনো দেশে এ প্রটোকল মেনে কোনো চিকিৎসক বা চিকিৎসাকেন্দ্রের পক্ষেই প্রসব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। কারণ এখানে জনসংখ্যার তুলনায় ডাক্তার, নার্স ও সেবাকন্দ্র—সব কিছুইর সংকট রয়েছে। একজন ডাক্তারকে অনেক রোগী সামলাতে হয়। এ জন্যই এ দেশে পার্টোগ্রাফ প্রটোকল সঠিক মাত্রায় মানা হয় না। তবে আনুষঙ্গিক বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই রোগী ও গর্ভের সন্তানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

হটলাইন নম্বর
xxxxx